Wednesday, October 26, 2016

 রাফ‘উল ইয়াদায়েন করার (হাত ওঠানোর)  ছহীহ হাদীছ সমূহ :


রাফ‘উল ইয়াদায়েন করার ছহীহ হাদীছ সমূহ :

عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللهِ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ  كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ وَإِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوْعِ وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنْ الرُّكُوْعِ رَفَعَهُمَا كَذَلِكَ أَيْضًا وَقَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ وَكَانَ لَا يَفْعَلُ ذَلِكَ فِى السُّجُوْدِ.

সালেম ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (ছাঃ) যখন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখন কাঁধ বরাবর দুই হাত উত্তোলন করতেন। অনুরূপ যখন রুকূ করার জন্য তাকবীর দিতেন এবং যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন তখনও দুই হাত উত্তোলন করতেন এবং ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ রাববানা ওয়া লাকাল হামদ’ বলতেন। তিনি সিজদায় এমনটি করতেন না।[1]

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ  إِذَا قَامَ فِى الصَّلَاةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُوْنَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَكَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ حِيْنَ يُكَبِّرُ لِلرُّكُوْعِ وَيَفْعَلُ ذَلِكَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنْ الرُّكُوْعِ وَيَقُوْلُ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ وَلَا يَفْعَلُ ذَلِكَ فِى السُّجُوْدِ.

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে দেখেছি তিনি যখন ছালাতে দাঁড়াতেন, তখন কাঁধ বরাবর দুই হাত উত্তোলন করতেন। যখন তিনি রুকূর জন্য তাকবীর দিতেন তখনও এটা করতেন। রুকূ থেকে যখন মাথা উঠাতেন, তখনও দুই হাত উঠাতেন এবং ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন। তিনি সিজদায় এমনটি করতেন না।[2]

عَنْ عَلِىِّ بْنِ أَبِىْ طَالِبٍ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ  أَنَّهُ كَانَ إِذَا قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ الْمَكْتُوْبَةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَيَصْنَعُ مِثْلَ ذَلِكَ إِذَا قَضَى قِرَاءَتَهُ وَأَرَادَ أَنْ يَرْكَعَ وَيَصْنَعُهُ إِذَا رَفَعَ مِنَ الرُّكُوْعِ وَلاَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِىْ شَىْءٍ مِنْ صَلاَتِهِ وَهُوَ قَاعِدٌ وَإِذَا قَامَ مِنَ السَّجْدَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ كَذَلِكَ وَكَبَّرَ.

আলী (রাঃ) রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি যখন ফরয ছালাতে দাঁড়াতেন, তখন তাকবীর দিতেন এবং কাঁধ বরাবর দুই হাত উত্তোলন করতেন। যখন তিনি ক্বিরাআত শেষ করতেন ও রুকূতে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখনও তিনি অনুরূপ করতেন। যখন তিনি রুকূ থেকে উঠতেন তখনও তিনি অনুরূপ করতেন। তবে বসা অবস্থায় তিনি রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন না। কিন্তু যখন তিনি দুই রাক‘আত শেষ করে দাঁড়াতেন, তখন অনুরূপ রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন এবং তাকবীর দিতেন। [3]

عَنْ نَافِعٍ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ إِذَا دَخَلَ فِي الصَّلَاةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَامَ مِنْ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ وَرَفَعَ ذَلِكَ ابْنُ عُمَرَ إِلَى نَبِيِّ اللهِ  .

নাফে‘ (রাঃ) বলেন, ইবনু ওমর (রাঃ) যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন তাকবীর দিতেন এবং দুই হাত উঠাতেন। যখন রুকূ করতেন তখনও দুই হাত উঠাতেন, যখন ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন এবং যখন দুই রাক‘আতের পর দাঁড়াতেন, তখনও দুই হাত উত্তোলন করতেন। ইবনু ওমর (রাঃ) এই বিষয়টিকে রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্বোধন করতেন।[4]

عن عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ   افْتَتَحَ التَّكْبِيْرَ فِى الصَّلَاةِ فَرَفَعَ يَدَيْهِ حِيْنَ يُكَبِّرُ حَتَّى يَجْعَلَهُمَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَإِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوْعِ فَعَلَ مِثْلَهُ وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَعَلَ مِثْلَهُ وَقَالَ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ وَلَا يَفْعَلُ ذَلِكَ حِيْنَ يَسْجُدُ وَلَا حِيْنَ يَرْفَعُ رَأْسَهُ مِنْ السُّجُوْدِ.

আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে তাকবীর দিয়ে ছালাত শুরু করতে দেখেছি। তিনি যখন তাকবীর দিতেন তখন দুই হাত উত্তোলন করতেন এবং কাঁধ বরাবর উঠাতেন। আর যখন রুকূর জন্য তাকবীর দিতেন এবং ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখনও দুই হাত উত্তোলন করতেন। তখন তিনি ‘রাববানা ওয়া লাকাল হামদ’ বলতেন। এমনটি তিনি সিজদার সময় করতেন না এবং সিজদা থেকে মাথা উঠানোর সময়ও এমনটি করতেন না।[5]

সুধী পাঠক! মাত্র কয়েকটি বর্ণনা এখানে উল্লেখ করা হল। তবে রাফ‘উল ইয়াদায়েনের হাদীছের সংখ্যা অনেক।[6] রুকূতে যাওয়া ও রুকূ হতে উঠার সময় ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ করা সম্পর্কে চার খলীফা সহ প্রায় ২৫ জন ছাহাবী থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ রয়েছে। একটি হিসাব মতে ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’-এর হাদীছের রাবী সংখ্যা ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’ সহ অন্যূন ৫০ জন ছাহাবী[7] এবং সর্বমোট ছহীহ হাদীছ ও আছারের সংখ্যা অন্যূন চার শত।[8] এ জন্য ইমাম সুয়ূত্বী, আলবানীসহ প্রমুখ বিদ্বান ‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’-এর হাদীছকে ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের বলে স্বীকৃতি দান করেছেন।[9] ফালিল্লা-হিল হামদ।

ফুটনোটঃ[1]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, ছহীহ বুখারী হা/৭৩৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০২, (ইফাবা হা/৬৯৯-৭০৩, ২/১০০-১০২ পৃঃ); এছাড়া হা/৭৩৬, ৭৩৭, ৭৩৮, ৭৩৯ দ্রঃ; ছহীহ মুসলিম হা/৮৮৭, ৮৮৮, ৮৮৯, ৮৯০, ৮৯১, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৬৮, (ইফাবা হা/৭৪৫-৭৪৯), ‘ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৯।

[2]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, ছহীহ বুখারী হা/৭৩৬।

[3]. ছহীহ আবুদাঊদ হা/৭৪৪, ১/১০৯ পৃঃ।

[4]. بَاب رَفْعِ الْيَدَيْنِ إِذَا قَامَ مِنْ الرَّكْعَتَيْنِ -ছহীহ বুখারী হা/৭৩৯, ১/১০২ পৃঃ; মিশকাত হা/৭৯৪ ও ৭৯৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৭৩৮ ও ৭৩৯, ২য় খন্ড, পৃঃ ২৫৩।

[5]. ছহীহ বুখারী হা/৭৩৮, ১/১০২ পৃঃ।

[6]. বুখারী হা/৭৩৫, ৭৩৬, ৭৩৭, ৭৩৮, ৭৩৯= ৫টি; ছহীহ মুসলিম হা/৮৮৭, ৮৮৮, ৮৮৯, ৮৯০, ৮৯১= ৫টি; আবুদাঊদ হা/৭২১, ৭২২, ৭২৩, ৭২৫, ৭২৬, ৭২৮, ৭২৯, ৭৩০, ৭৪১, ৭৪২, ৭৪৩, ৭৪৪, ৭৪৫, ৭৪৬, ৭৪৭,, ৭৬১= ১৬টি; নাসাঈ হা/৮৭৬, ৮৭৭, ৮৭৮, ৮৭৯, ৮৮০, ৮৮১, ৮৮৯, ১০২৪, ১০২৫, ১০২৫৫, ১০৫৬, ১০৫৭, ১০৫৯= ১৩টি; ইবনু মাজাহ হা/৮৫৮, ৮৫৯, ৮৬০, ৮৬১, ৮৬২, ৮৬৩, ৮৬৮= ১১টি; তিরমিযী হা/২৫৫। শুধু ‘কুতুবে সিত্তাহ্র’ মধ্যেই প্রায় ৫১টি হাদীছ এসেছে।

[7]. ফাৎহুল বারী ২/২৫৮ পৃঃ, হা/৭৩৭-এর ব্যাখ্যা, ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৮৪।

[8]. মাজদুদ্দীন ফীরোযাবাদী (৭২৯-৮১৭ হিঃ), সিফরুস সা‘আদাত (লাহোর : ১৩০২ হিঃ, ফার্সী থেকে উর্দূ), ১৫ পৃঃ; গৃহীতঃ প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ছালাতুর রাসূল (ছাঃ), পৃঃ ১০৮।

[9]. তুহফাতুল আহওয়াযী ২/১০০, ১০৬ পৃঃ; ছিফাতু ছালাতিন নবী, পৃঃ ১২৮।


সূত্র :http://www.hadithbd.com/




if yuo have any question, coment me?
                  নাভীর নীচে হাত বাঁধা নিয়ে সঠিক তথ্য



নাভীর নীচে হাত বাঁধা :

ছহীহ হাদীছের দাবী হল বুকের উপর হাত বেঁধে ছালাত আদায় করা। নাভীর নীচে হাত বেঁধে ছালাত আদায় করার পক্ষে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। এর পক্ষে যত হাদীছ বর্ণিত হয়েছে সবই ত্রুটিপূর্ণ।

(১) عَنْ أَبِىْ جُحَيْفَةَ أَنَّ عَلِيًّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مِنْ السُّنَّةِ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِي الصَّلَاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

(১) আবু জুহায়ফাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আলী (রাঃ) বলেছেন, সুন্নাত হল ছালাতের মধ্যে নাভীর নীচে হাতের পাতার উপর হাতের পাতা রাখা।[1]

তাহক্বীক্ব : হাদীছটি নিতান্তই যঈফ। উক্ত সনদে আব্দুর রহমান ইবনু ইসহাক নামে একজন রাবী আছে। সে সকল মুহাদ্দিছের ঐকমত্যে যঈফ।[2] ইমাম বায়হাক্বী বলেন, ‘উক্ত হাদীছের সনদ ছহীহ বলে প্রমাণিত হয়নি। আব্দুর রহমান ইবনে ইসহাক্ব একাকী এটা বর্ণনা করেছে। সে পরিত্যক্ত রাবী।[3] আল্লামা আইনী হানাফী (মৃঃ ৮৫৫ হিঃ) বলেন, ‘এর সনদ ছহীহ নয়’।[4] ইবনু হাজার আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২) বলেন, এর সনদ যঈফ’।[5] শায়খ আলবানীও যঈফ বলেছেন।[6]

(২) عَنْ أَبِىْ وَائِلٍ قَالَ قَالَ أَبُوْ هُرَيْرَةَ أَخْذُ الْأَكُفِّ عَلَى الْأَكُفِّ فِى الصَّلَاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

(২) আবী ওয়ায়েল (রাঃ) বলেন, আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেছেন, ছালাতের মধ্যে এক হাত আরেক হাতের উপর রেখে নাভীর নীচে রাখবে।[7]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি নিতান্তই যঈফ। ইমাম আবুদাঊদ বলেন,  سَمِعْتُ أَحْمَدَ بْنَ حَنْبَلٍ يُضَعِّفُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ إِسْحَقَ الْكُوْفِيَّ ‘আমি আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আব্দুর রহমান ইবনু ইসহাক্ব যঈফ’।[8] ইবনু আব্দিল বার্র এই হাদীছকে যঈফ বলেছেন।[9] শায়খ আলবানীও যঈফ বলেছেন।[10]

(৩) عَنْ أَنَسٍ قَالَ ثَلاَثٌ مِنْ أَخْلاَقِ النُّبُوَّةِ تَعَجُّلُ الْإِفْطاَرِ وَتَأْخِيْرُ السَّحُوْرِ وَوَضْعُ الْيَدِ الْيُمْنىَ عَلَى الْيَدِ الْيُسْرَى فِى الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

(৩) আনাস (রাঃ) বলেন, তিনটি জিনিস নবীদের চরিত্র। (ক) দ্রুত ইফতার করা (খ) দেরীতে সাহারী করা এবং (গ) ছালাতের মধ্যে ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করে নাভীর নীচে রাখা।[11]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। মুহাদ্দিছ যাকারিয়া বিন গোলাম কাদের বলেন, ‘এই শব্দে কেউ কোন সনদ উল্লেখ করেননি’।[12] মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন, ‘আমি এই হাদীছের সনদ সম্পর্কে অবগত নই’।[13] উক্ত বর্ণনা সম্পর্কে না জেনেই অনেক লেখক তা দলীল হিসাবে পেশ করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি দুঃখজনক।[14] অবশ্য এ মর্মে বর্ণিত ছহীহ হাদীছে ‘নাভীর নীচে’ অংশটুকু নেই।[15]

(৪) عَنْ وَائِلِ ابْنِ حُجْرٍ فِىْ صِفَةِ صَلاَةِ رَسُوْلِ اللهِ  قَالَ رَأَيْتُ النَّبِىَّ  يَضَعُ يَمِيْنَهُ عَلَى شِمَالِهِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

(৪) ওয়াইল ইবনু হুজর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাতের পদ্ধতির ব্যাপারে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করে নাভীর নীচে রাখতে দেখেছি।[16]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। ‘নাভীর নীচে’ কথাটুকু হাদীছে নেই। সুতরাং এই অংশটুকু জাল করা হয়েছে। শায়খ মুহাম্মাদ হায়াত সিন্দী বলেন, زِيَادَةُ تَحْتَ السُّرَّةِ نَظْرٌ بَلْ هِىَ غَلَطٌ مَنْشَؤُهُ السَّهْوُ فَإِنِّىْ رَاجَعْتُ نُسْخَةً صَحِيْحَةً مِنَ الْمُصَنِّفِ فَرَأَيْتُ فِيْهَا هَذَا الْحَدِيْثَ بِهَذَا السَّنَدِ وَبِهَذِهِ الْأَلْفَاظِ إِلاَّ أَنَّهُ لَيْسَ فِيْهَا تَحْتَ السُّرَّةِ ‘নাভীর নীচে’ এই অতিরিক্ত অংশ ত্রুটিপূর্ণ। বরং তা স্পষ্ট ভুল। মূলেই ভুল রয়েছে। আমি সংকলকের মূল কপি দেখেছি। সেখানে এই সনদ ও শব্দগুলো দেখেছি। কিন্তু তার মধ্যে ‘নাভীর নীচে’ অংশটুকু নেই’।[17]

জ্ঞাতব্য : উক্ত বর্ণনা ভিত্তিহীন হলেও মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বার নামে ‘মাযহাব বিরোধীদের স্বরূপ সন্ধানে’ বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকে বিশুদ্ধ বলা হয়েছে।[18] যার ভিত্তি নেই তাকে বিশুদ্ধ বলার উদ্দেশ্য কি? মড়ার উপর খাড়ার ঘা?

(৫) إِنَّ النَّبِىَّ  قَالَ إِنَّ مِنَ السُّنَّةِ وَضْعُ الْيُمْنىَ عَلَى الشِّمَالِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

(৫) নবী করীম (ছাঃ) বলেন, সুন্নাত হল বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে নাভীর নীচে রাখা।[19]

তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি মিথ্যা ও বানোয়াট। কারণ উক্ত মর্মে রাসূল (ছাঃ) থেকে কোন বর্ণনা নেই। মদ্বীনা পাবলিকেশান্স থেকে প্রকাশিত ‘হানাফীদের কয়েকটি জরুরী মাসায়েল’ নামক বইয়ে উক্ত শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে।[20]

বিশেষ সর্তকতা : কুদূরী ও হেদায়া কিতাবে বলা হয়েছে, وَيَعْتَمِدُ بِيَدِهِ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى تَحْتَ السُّرَّةِ  ‘এবং ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করে নাভীর নীচে রাখবে’।[21] অতঃপর হেদায়া কিতাবে দলীল হিসাবে পেশ করা হয়েছে, ‘কারণ রাসূল (ছাঃ)-এর কথা হল, لِقَوْلِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ إنَّ مِنَ السُّنَّةِ وَضْعَ الْيَمِيْنِ عَلَى الشِّمَالِ تَحْتَ السُّرَّةِ  ‘নিশ্চয় ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করে নাভীর নীচে রাখা সুন্নাত’।[22] অথচ উক্ত বর্ণনার কোন ভিত্তি নেই।

সুধী পাঠক! হানাফী মাযহাবের সর্বাধিক অনুসরণীয় কিতাবে যদি এভাবে রাসূল (ছাঃ)-এর নামে মিথ্যা বর্ণনা মিশ্রিত করা হয়, তাহলে মানুষ সত্যের সন্ধান পাবে কোথায়?

(৬) عَنِ ابْنِ جَرِيْرٍ الضَّبِّيِّ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ رَأَيْتُ عَلِيًّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يُمْسِكُ شِمَالَهُ بِيَمِيْنِهِ عَلَى الرُّسْغِ فَوْقَ السُّرَّةِ.

(৬) গাযওয়ান ইবনু জারীর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি আলী (রাঃ)-কে ডান হাত দ্বারা বাম হাতকে কব্জির উপর রেখে নাভীর উপর বাঁধতে দেখেছি।[23]

তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ।[24]  ইমাম আবুদাঊদ বলেন,  وَرُوِيَ عَنْ سَعِيْدِ بْنِ جُبَيْرٍ فَوْقَ السُّرَّةِ قَالَ أَبُوْ مِجْلَزٍ تَحْتَ السُّرَّةِ وَرُوِيَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَلَيْسَ بِالْقَوِيِّ. ‘সাঈদ ইবনে জুবাইর-এর পক্ষ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে- নাভীর উপরে হাত রাখতেন। আর আবু মিজলায বলেছেন, নাভীর নীচে হাত রাখতেন। অনুরূপ আবু হুরায়রা থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তবে কোনটিই নির্ভরযোগ্য নয়’।[25]

(৭) عَنِ الحَجَّاجِ بْنِ حَسَّانَ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا مِجْلَزٍ أَوْ سَأَلْتُهُ  قَالَ قُلْتُ كَيْفَ أَصْنَعُ؟ قَالَ يَضَعُ بَاطِنَ كَفِّ يَمِيْنِهِ عَلَى ظَاهِرِ كَفِّ شِمَالِهِ وَيَجْعَلُهَا أَسْفَلَ مِنَ السُّرَّةِ.

(৭) হাজ্জাজ ইবনু হাস্সান বলেছেন, আমি আবু মিজলাযকে বলতে শুনেছি অথবা তাকে প্রশ্ন করেছি, আমি কিভাবে হাত রাখব? তিনি বললেন, ডান হাতের পেট বাম হাতের পিঠের উপর রাখবে এবং একেবারে নাভীর নীচে রাখবে।[26]

তাহক্বীক্ব : উক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এর সনদ বিচ্ছিন্ন।[27] যদিও কেউ তাকে ‘সুন্দর সনদ’ বলে মন্তব্য করেছেন।[28] কিন্তু ছহীহ হাদীছের বিরোধী হলে কিভাবে তাকে সুন্দর সনদ বলা যায়? [29]

(8) عَنْ أَبِى الزُّبَيْرِ قَالَ أَمَرَنِىْ عَطَاءٌ أَنْ أَسْأَلَ سَعِيْدًا أَيْنَ تَكُوْنُ الْيَدَانِ فِى الصَّلاَةِ؟ فَوْقَ السُّرَّةِ أَوْ أَسْفَلَ مِنَ السُّرَّةِ؟ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ فَوْقَ السُّرَّةِ.

(৮) যুবাইর বলেন, আত্বা আমাকে বললেন, আমি যেন সাঈদ ইবনু জুবাইরকে জিজ্ঞেস করি, ছালাতের মধ্যে দুই হাত কোথায় থাকবে? নাভীর উপরে না নাভীর নীচে? অতঃপর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, নাভীর উপরে।[30]

তাহক্বীক্ব : সনদ যঈফ। এর সনদে ইয়াহইয়া ইবনু আবী তালেব ও যায়েদ ইবনু হুবাব নামে রাবী আছে, তারা ত্রুটিপূর্ণ।[31] মূলতঃ পরবর্তীতে এই বর্ণনার মাঝে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।[32]

(9) قاَلَ عَبْدُ اللهِ رَأَيْتُ أَبِىْ إِذَا صَلَّى وَضَعَ يَدَيْهِ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَوْقَ السُّرَّةِ.

(৯) আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ (রহঃ) বলেন, আমি আমার আব্বাকে দেখেছি যে, তিনি যখন ছালাত আদায় করতেন তখন তিনি তার এক হাত অপর হাতের উপর স্থাপন করে নাভীর উপরে রাখতেন।[33]

তাহক্বীক্ব : ইমাম আহমাদ (রহঃ) নাভীর নীচে হাত বাঁধার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেমন ইমাম আবুদাঊদ বলেন, سَمِعْتُ أَحْمَدَ بْنَ حَنْبَلٍ يُضَعِّفُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ إِسْحَقَ الْكُوفِيَّ ‘আমি আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আব্দুর রহমান ইবনু ইসহাক্ব যঈফ’।[34] সুতরাং উক্ত বর্ণনার দিকে ভ্রুক্ষেপ করার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া ইমাম নববী ও আলবানী গ্রহণ করেননি।[35] ইমাম আহমাদ সম্পর্কে নাভীর নীচে ও উপরে দুই ধরনের কথা এসেছে। মূলতঃ তা সন্দেহ যুক্ত। যেমনটি দাবী করেছেন কাযী আবু ইয়ালা আল-ফার্র।[36] সুতরাং তার পক্ষ থেকে বুকের উপর হাত বাঁধাই প্রমাণিত হয়। যাকে ইমাম আবুদাঊদ ছহীহ বলেছেন।[37]

বিভ্রান্তি থেকে সাবধান :

বাজারে প্রচলিত ‘নামায শিক্ষা’ বইগুলোতে উক্ত যঈফ, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বর্ণনা দ্বারা নাভীর নীচে হাত বাঁধার দলীল পেশ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে মাওলানা আব্দুল মতিন প্রণীত ‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ একটি। উক্ত লেখক শুধু বানোয়াট বর্ণনাই পেশ করেননি, বরং রীতি মত ছহীহ হাদীছের অপব্যাখ্যা করে রাসূল (ছাঃ)-এর আমলকে যবাই করে নিজেদেরকে ‘প্রকৃত আহলে হাদীস’ বলে দাবী করেছেন।[38] কথায় বলে ‘অন্ধ ছেলের নাম পদ্মলোচন’। কারণ অন্ধ মাযহাবের মরণ ফাঁদে পড়ে কেউ আহলেহাদীছ পরিচয় ব্যক্ত করতে পারে না। এ জন্য ‘আহলেহাদীছ’ পরিচয় দেয়ার সাহস হয় না।

ফুটনোটঃ

[1]. আবুদাঊদ হা/৭৫৬; আহমাদ ১/১১০; দারাকুৎনী ১/২৮৬; ইবনু আবী শায়বাহ ১/৩৯১; বায়হাক্বী ২/৩১। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় ছাপা আবুদাঊদে উক্ত মর্মে কয়েকটি হাদীছ নেই।

[2]. وَقَدِ اتَّفَقَ الْأَئِمَّةُ عَلَى تَضْعِيْفِهِ -তানক্বীহ, পৃঃ ২৮৪।

[3]. لَمْ يَثْبُتْ إِسْنَادُهُ تَفَرَّدَ بِهِ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنِ إِسْحَاقَ الْوَاسِطِىِّ وَهُوَ مَتْرُوْكٌ -বায়হাক্বী, আল-মা‘রেফাহ ১/৪৯৯।

[4]. إِسْنَادُهُ غَيْرُ صَحِيْحٍ -উমদাতুল ক্বারী ৫/২৮৯।

[5]. إسناده ضعيف -ইবনু হাজার আসক্বালানী, আদ-দিরায়াহ ১/১২৮।

[6]. যঈফ আবুদাঊদ হা/৭৫৬।

[7]. আবুদাঊদ হা/৭৫৮।

[8]. আবুদাঊদ হা/৭৫৮।

[9]. ঐ, আত-তামহীদ ২০/৭৫।

[10]. যঈফ আবুদাঊদ হা/৭৫৮।

[11]. ইমাম ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা ৪/১৫৭; তানক্বীহ, পৃঃ ২৮৫।

[12]. وَلَمْ يَذْكُرْ لَهُ سَنَدًا بِهَذَا اللَّفْظِ وَإِِنَّهَا عَلَّقَهُ -তানক্বীহ, পৃঃ ২৮৫।

[13]. لَمْ أَقِفْ عَلَى سَنَدِ هَذَا الْحَدِيْثِ -ঐ, তুহফাতুল আহওয়াযী ১/২১৫।

[14]. মাযহাব বিরোধীদের স্বরূপ সন্ধানে, পৃঃ ২৯১; নবীজীর নামায, পৃঃ ১৫০।

[15]. ইবনু হিববান হা/১৭৬৭; সনদ ছহীহ, ছিফাতু ছালাতিন নাবী, পৃঃ ৮৭; ইবনু ক্বাইয়িম, তাহযীব সুনানে আবী দাঊদ ১/১৩০ - حَدِيث أَبِي حُمَيْدٍ هَذَا حَدِيث صَحِيح مُتَلَقًّى بِالْقَبُولِ لَا عِلَّة لَهُ وَقَدْ أَعَلَّهُ قَوْم بِمَا بَرَّأَهُ اللَّه।

[16]. তানক্বীহ, পৃঃ ২৮৫; তুহফাতুল আহওয়াযী ১/২১৪।

[17]. তুহফাতুল আহওয়াযী ১/২১৪।

[18]. ঐ, পৃঃ ২৯০।

[19]. হেদায়াহ ১/৮৬; হানাফীদের জরুরী মাসায়েল, পৃঃ ২৬।

[20]. ঐ, পৃঃ ২৬।

[21]. আবুল হুসাইন আহমাদ আল-কুদূরী, মুখতাছারুল কুদূরী, পৃঃ ২৮; হেদায়া ১/১০৬ পৃঃ।

[22]. হেদায়া ১/১০৬ পৃঃ; নাছবুর রাইয়াহ ১/৩১৩ পৃঃ।

[23]. আবুদাঊদ হা/৭৫৭; বায়হাক্বী ২/৩০।

[24]. যঈফ আবুদঊদ হা/৭৫৭।

[25]. আবুদাঊদ হা/৭৫৭।

[26]. ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৯৬৩, ১/৩৯১; মাযহাব বিরোধীদের স্বরূপ সন্ধানে, পৃঃ ২৯১।

[27]. আওনুল মা‘বূদ ২/৩২৪ পৃঃ - مقطوع لأن أبا مجلز تابعي والمقطوع لا يقوم به الحجة।

[28]. যঈফ আবুদাঊদ হা/১৩০-এর আলোচনা দ্রঃ।

[29]. মির‘আতুল মাফাতীহ ৩/৬৩ পৃঃ- أن هذا قول تابعي ينفيه الحديث المرفوع فلا يلتفت إليه।

[30]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা হা/২৪৩৪; আওনুল মা‘বূদ ২/৩২৪ পৃঃ।

[31]. আওনুল মা‘বূদ ২/৩২৪ পৃঃ।

[32]. যঈফ আবুদাঊদ হা/১৩০।

[33]. ইরওয়াউল গালীল ২/৭০ পৃঃ।

[34]. আবুদাঊদ হা/৭৫৮।

[35]. ইরওয়াউল গালীল ২/৭০ পৃঃ।

[36]. আল-মাসাইলুল ফিক্বহিয়াহ, ১/৩২ পৃঃ - وهذا يحتمل أن يكون ظناً من الراوي أنها كانت على السرة ويحتمل أن يكون سهواً من أحمد في ذلك।

[37]. আবুদাঊদ হা/৭৫৯, সনদ ছহীহ।

[38]. দলিলসহ নামাযের মাসায়েল , পৃঃ ২৪।


সূত্র :http://www.hadithbd.com/

                   নামাজ বেহেস্তের চাবি


আপনি নামাজে কি (রাফ‘উল ইয়াদায়েন) হাত ওঠান ? জেনে নিন নামাজে হাত ওঠা সম্পর্কে সহ্হি ও যঈফ হাদিস  সমূহ :  


ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন না করা


ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন না করা :
ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করা এক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। এর পক্ষে শত শত ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে অধিকাংশ মুছল্লী উক্ত সুন্নাতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। উক্ত ঠুনকো যুক্তিগুলোর অন্যতম হল, কতিপয় জাল ও যঈফ হাদীছ। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা পেশ করা হল-
(১) عَنْ عَلْقَمَةَ قَالَ عَبْدُ اللهِ بْنُ مَسْعُوْدٍ أَلَا أُصَلِّىْ بِكُمْ صَلَاةَ رَسُوْلِ اللهِ ؟ قَالَ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا مَرَّةً.
(১)  আলক্বামা (রাঃ) বলেন, একদা আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) বললেন, আমি কি তোমাদেরকে রাসূল (ছাঃ)-এর ছালাত শিক্ষা দিব না? রাবী বলেন, অতঃপর তিনি ছালাত পড়ালেন। কিন্তু একবার ছাড়া তিনি তার দুই হাত উত্তোলন করলেন না।[1] উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন কিতাবে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর নামে আরো কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।[2]
তাহক্বীক্ব : হাদীছটি যঈফ। ইমাম আবুদাঊদ (২০৪-২৭৫ হিঃ) উক্ত হাদীছ বর্ণনা করে বলেন, هَذَا حَدِيْثٌ مُخْتَصَرٌ مِّنْ حَدِيْثٍ طَوِيْلٍ وَلَيْسَ هُوَ بِصَحِيْحٍ عَلَى هَذَا اللَّفْظِ ‘এই হাদীছটি লম্বা হাদীছের সংক্ষিপ্ত রূপ। আর এই শব্দে হাদীছটি ছহীহ নয়’।[3] উল্লেখ্য যে, ভারতীয় ছাপা আবুদাঊদে উক্ত মন্তব্য নেই। এর কারণ প্রকাশকরাই ভাল জানেন। ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ) বলেছেন,
 قَدْ ثَبَتَ حَدِيْثُ مَنْ يَرْفَعُ يَدَيْهِ وَذَكَرَ حَدِيْثَ الزُّهْرِىِّ عَنْ سَالِمٍ عَنْ أَبِيْهِ وَلَمْ يَثْبُتْ حَدِيْثُ ابْنِ مَسْعُوْدٍ أَنَّ النَّبِىَّ  لَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلاَّ فِىْ أَوَّلِ مَرَّةٍ.
‘যে ব্যক্তি রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে তার হাদীছ সাব্যস্ত হয়েছে। অতঃপর তিনি সালেম বর্ণিত যুহরীর হাদীছ পেশ করেন। তবে রাসূল (ছাঃ) একবার ছাড়া রাফ‘উল ইয়াদায়েন করেননি মর্মে ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ সাব্যস্ত হয়নি।[4] উক্ত হাদীছ সম্পর্কে ইবনু হিববান বলেন,
هَذَا أَحْسَنُ خَبَرٍ رَوَى أَهْلُ الْكُوْفَةِ فِىْ نَفْيِ رَفْعِ الْيَدَيْنِ فِي الصَّلاَةِ عِنْدَ الرُّكُوْعِ وَعِنْدَ الرَّفْعِ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْحَقِيْقَةِ أَضْعَفُ شَيْءٍ يُعَوَّلُ عَلَيْهِ لِأَنَّ لَهُ عِلَلاً تُبْطِلُهُ.
‘রাফ‘উল ইয়াদায়েন’ না করার পক্ষে কূফাবাসীদের এটিই সবচেয়ে প্রিয় দলীল হলেও এটিই সবচেয়ে দুর্বল দলীল, যার উপরে নির্ভর করা হয়। কারণ এতে এমন ত্রুটি রয়েছে, যা একে বাতিল বলে গণ্য করে’।[5] আল্লামা ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রহঃ) আলোচনা শেষে বলেন,
فَثَبَتَ بِهَذَا كُلِّهِ أَنَّ حَدِيْثَ ابْنِ مَسْعُوْدٍ لَيْسَ بِصَحِيْحٍ وَلاَ بِحَسَنٍ بَلْ هُوَ ضَعِيْفٌ لاَ يَقُوْمُ بِمِثْلِهِ حُجَّةٌ وَأَيْنَ يَقَعُ تَحْسِيْنُ التِّرْمِذِىِّ مَعَ مَا فِيْهِ مِنَ التَّسَاهُلِ وَتَصْحِيْحُ ابْنِ حَزَمٍ مِنْ طَعْنِ أُولَئِكَ الْأَئِمَّةِ.
‘অতএব এ সমস্ত দলীল দ্বারা প্রমাণিত হল যে, ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ ছহীহ নয়, হাসানও নয়। বরং যঈফ। এরূপ হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না। কোথায় থাকবে ইমাম তিরমিযীর হাসান বলে মন্তব্য করা, যাতে আছে শৈথিল্য? এছাড়া হাদীছের ইমামগণের দোষারোপের মুখে ইবনু হাযামের ছহীহ হওয়ার মন্তব্য কিভাবে গ্রহণযোগ্য হবে?[6]
জ্ঞাতব্য : উক্ত মন্তব্য সমূহের পরও আলবানী এই বর্ণনাকে ছহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি যারা রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে না, তাদেরকে উক্ত হাদীছের প্রতি আমল করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার পর রাফ‘উল ইয়াদায়েন করার পক্ষে রাসূল (ছাঃ)-এর পক্ষ থেকে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। বরং মুহাদ্দিছ ওলামায়ে কেরামের নিকট এটি ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের বর্ণনা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এছাড়া প্রত্যেক তাকবীরেই রাফ‘উল ইয়াদায়েন করা সম্পর্কে বহু হাদীছ রয়েছে। ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর সূত্র ছাড়া রাসূল (ছাঃ) থেকে এই আমল পরিত্যাগ করার কোন ছহীহ প্রমাণ নেই। তবে ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর হাদীছের উপর আমল করা উচিৎ নয়। কারণ এটি না-বোধক। আর হানাফীসহ অন্যান্যদের নিকট এটি বারবার উল্লেখিত হয় যে, হ্যাঁ-বোধক না-বোধকের উপর প্রাধান্য পায়। একটি হ্যাঁ-বোধক থাকার কারণে যদি এমনটি হয়, তাহলে একটি ঐক্যবদ্ধ জামা‘আত থাকলে এই মাসআলার সিদ্ধান্ত কী হতে পারে?
فَيَلْزَمُهُمْ عَمَلاً بِهَذِهِ الْقَاعِدَةِ مَعَ انْتِفَاءِ الْمُعَارِضِ أَنْ يَّأْخُذُوْا بِالرَّفْعِ وَأَنْ لاَ يَتَعَصَّبُوْا لِلْمَذْهَبِ بَعْدَ قِيَامِ الْحُجَّةِ وَلَكِنَّ الْمُؤَسَّفَ أَنَّهُ لَمْ يَأْخُذْ بِهِ مِنْهُمْ إِلاَّ أَفْرَادٌ مِنَ الْمُتَقَدِّمِيْنَ وَالْمُتَأَخِّرِيْنَ حَتَّى صَارَ التَّرْكُ شِعَارًا لَهُمْ.
‘সুতরাং তাদের উচিৎ হবে, উক্ত মূলনীতির আলোকে বিরোধিতাকে প্রত্যাখ্যান করে এই আমলকে অাঁকড়ে ধরা। অর্থাৎ তারা রাফ‘উল ইয়াদায়েন করবে এবং দলীল সাব্যস্ত হওয়ার পর মাযহাবী গোঁড়ামী প্রদর্শন করবে না। কিন্তু দুঃখজনক হল, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্যে কতিপয় ব্যক্তি ছাড়া, তাদের কেউ এই আমল গ্রহণ করেনি। ফলে উক্ত আমল বর্জন করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে’।[7]
উল্লেখ্য যে, আলবানীর দোহায় দিয়ে অনেকে উক্ত হাদীছ উল্লেখ করে রাফ‘উল ইয়াদায়েনের বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং বিভ্রান্তি ছড়ান। কিন্তু আলবানীর মূল বক্তব্য পেশ করেন না। এটা এক ধরনের প্রতারণা। অতএব পাঠক সমাজ সাবধান!
(২) عَنْ عَبْدِ الله قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ  وَأبِىْ بَكْرٍ وَعُمَرَ فَلَمْ يَرْفَعُوْا أَيْدِيْهِمْ إِلَّا عِنْدَ اِفْتِتَاحِ الصَّلَاةِ.
(২) আব্দুল্লাহ (ইবনু মাস‘ঊদ) (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করেছি, কিন্তু তারা ছালাত আরম্ভের তাকবীর ছাড়া আর কোথাও হাত উত্তোলন করেননি।[8]
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি ভিত্তিহীন।[9] ইমাম বায়হাক্বী ও দারাকুৎনী উক্ত বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু জাবের এককভাবে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছে। হাম্মাদ থেকে এবং সে ইবরাহীম থেকে যঈফ হাদীছ বর্ণনাকারী।[10]
(৩) عَنِ الْبَرَاءِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ  كَانَ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَى قَرِيْبٍ مِنْ أُذْنَيْهِ ثُمَّ لَا يَعُوْدُ.
(৩) বারা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখন দুই কানের নিকটবর্তী পর্যন্ত দুই হাত উত্তোলন করতেন। অতঃপর তিনি আর এরূপ করতেন না।[11]
তাহক্বীক্ব : ‘অতঃপর তিনি আর হাত তুলতেন না’ কথাটুকু উক্ত হাদীছের সাথে পরবর্তীতে কেউ সংযোগ করেছে। আর ইমাম আবুদাঊদের ভাষ্য অনুযাযী এটা কূফাতে হয়েছে। কারণ মুসলিম বিশ্বের কোথাও এমনটি ঘটেনি। যেমন ইমাম আবুদাঊদ বলেন,
حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ يَزِيْدَ نَحْوَ حَدِيْثِ شَرِيْكٍ لَمْ يَقُلْ ثُمَّ لَايَعُوْدُ قَالَ سُفْيَانُ قَالَ لَنَا بِالْكُوْفَةِ بَعْدُ ثُمَّ لَايَعْوْدُ. وَرَوَى هَذَا الْحَدِيْثَ هُشَيْمٌ وَخَالِدٌ وَ إِدْرِيْسَ عَنْ يَزِيْدَ لَمْ يَذْكُرُوْا ثُمَّ لَايَعُوْدُ.
সুফিয়ান আমাদের কাছে ইয়াযীদ থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন, যা পূর্বের শারীক বর্ণিত হাদীছের ন্যায়। কিন্তু ‘অতঃপর আর করতেন না’ একথা বলেননি। সুফিয়ান বলেন, ‘পরবর্তীতে কূফায় আমাদেরকে উক্ত কথা বলা হয়েছে’। তিনি আরো বলেন, ‘ইয়াযীদ এই হাদীছটি হুশাইম, খালেদ ও ইদরীস থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘অতঃপর পুনরায় আর হাত তুলেননি’ কথাটি উল্লেখ করেননি’।[12]  তাছাড়াও হাদীছটি যঈফ। এর সনদে ইয়াযীদ বিন আবু যিয়াদ আছে। সে যঈফ রাবী। ইমাম আহমাদ বলেন, হাদীছটি নিতান্তই যঈফ।[13]
আসলে বর্ণনাটি একেবারেই উদ্ভট; বরং একে জাল বলাই শ্রেয়। কারণ ‘পুনরায় আর করেননি’ এই অংশটুকু কূফাতে কোন ব্যক্তি কর্তৃক সংযোজিত হয়েছে। মুহাদ্দিছ আবু ওমর বলেন, ইয়াযীদ একাকী বর্ণনা করেছে। অনেক মুহাদ্দিছ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু কেউই ‘পুনরায় আর হাত তুলেননি’ এই বক্তব্য উল্লেখ করেননি।[14] ইমাম ইবনু মাঈন বলেন, এই হাদীছের সনদ ছহীহ নয়। ইমাম আবুদাঊদ, ইমাম খাত্বাবী, ইমাম আহমাদ, বাযযার প্রমুখ মুহাদ্দিছ এই হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মূলকথা হল, শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিছগণ এ মর্মে একমত যে, হাদীছের শেষাংশে সংযোজিত বাড়তি অংশটুকু কোন মানুষের তৈরি, হাদীছের অংশ নয়।[15] অতএব উক্ত বর্ণনা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
(৪) حَدَّثَنَا سُفْْيَانُ بِإِسْنَادِهِ بِهَذَا قَالَ فَرَفَعَ يَدَيْهِ فِىْ أَوَّلِ مَرَّةٍ وَقَالَ بَعْضُهُمْ مَرَّةً وَاحَدَةً.
(৪) আবু সুফিয়ান আমাদের কাছে উক্ত সনদে হাদীছ বর্ণনা করে বলেন যে, তিনি প্রথমবার দুই হাত উত্তোলন করেছেন। তাদের কেউ বলেন, মাত্র একবার।[16]
তাহক্বীক্ব : একবার হাত উত্তোলন করা যে কূফার আমল, তা সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ)-এর বর্ণনায় ফুটে উঠেছে। যা পূর্বেও বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ইমাম বুখারী ও ইবনু আবী হাতেম এ সংক্রান্ত বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।[17] তাছাড়া কারো ব্যক্তিগত আমল শরী‘আতের দলীল হতে পারে না।
(৫) عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ  رَفَعَ يَدَيْهِ حِيْنَ افْتَتَحَ الصَّلَاةَ ثُمَّ لَمْ يَرْفَعْهُمَا حَتَّى اِنْصَرَفَ.
(৫) বারা ইবনু আযেব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে দেখেছি, তিনি যখন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখন দু’হাত উত্তোলন করতেন। অতঃপর ছালাত শেষ করা পর্যন্ত তিনি আর দু’হাত উত্তোলন করতেন না।[18]
তাহক্বীক্ব : হাদীছটি যঈফ। এর সনদে ইবনু আবী লায়লা নামে যঈফ রাবী আছে। ইমাম বায়হাক্বী বলেন, তার হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না।[19]তাছাড়া ইমাম আবুদাঊদ হাদীছটি উল্লেখ করে বলেন, هَذَا الْحَدِيْثُ لَيْسَ بِصَحِيْحٍ  ‘এই হাদীছ ছহীহ নয়’।[20]
(৬) عَنِ اِبْنِ عُمَرَ أنَّ النَّبِىَّ  كَانَ يَرْفَعُ يَدَهُ اِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ ثُمَّ لَا يَعُوْدُ.
(৬) ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ছালাত আরম্ভ করতেন, তখন দুই হাত উত্তোলন করতেন। অতঃপর আর তুলতেন না।[21]
তাহক্বীক্ব : ইমাম বায়হাক্বী ও হাকেম বলেন, বর্ণনাটি বাতিল ও মিথ্যা।[22]
(৭) عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عُمَرَ فَلَمْ يَكُنْ يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِلاَّ فِي التَّكْبِيرَةِ الْأُولَى مِنَ الصَّلَاةِ.
(৭) মুজাহিদ বলেন, আমি ইবনু ওমর (রাঃ)-এর পিছনে ছালাত আদায় করলাম। তিনি প্রথম তাকবীর ছাড়া আর রাফ‘উল ইয়াদায়েন করলেন না।[23]
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি যঈফ। এর সনদে আবুবকর ইবনু আইয়াশ নামে একজন রাবী আছে। ইমাম বুখারীসহ অন্যান্য মুহাদ্দিছ তাকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন।[24]আলবানী বলেন, ‘বর্ণনাটি শায। কারণ এটি অতি পরিচিত হাদীছের বিরোধী।[25]
জ্ঞাতব্য : কেউ কেউ উক্ত বর্ণনাগুলোর আলোকে বলতে চেয়েছেন, ইবনু ওমর (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর রাফ‘উল ইয়াদায়েন করা ছেড়ে দিয়েছিলেন।[26] কিন্তু উক্ত দাবী সঠিক নয়। কারণ অনেক ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে যে, ইবনু ওমর (রাঃ) আজীবন রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে ছালাত আদায় করেছেন। সরাসরি বুখারী ও মুসলিমে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। যেমন-
عَنْ نَافِعٍ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ إِذَا دَخَلَ فِي الصَّلَاةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا قَامَ مِنْ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ وَرَفَعَ ذَلِكَ ابْنُ عُمَرَ إِلَى نَبِيِّ اللهِ  .
নাফে‘ (রাঃ) বলেন, ইবনু ওমর (রাঃ) যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন তাকবীর দিতেন এবং দুই হাত উত্তোলন করতেন। যখন রুকূ করতেন তখনও দুই হাত উঠাতেন, যখন ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন এবং যখন দুই রাক‘আতের পর দাঁড়াতেন তখনও দুই হাত উত্তোলন করতেন। ইবনু ওমর (রাঃ) এই বিষয়টিকে রাসূল (ছাঃ)-এর দিকে সম্বোধন করেছেন।[27]
عَنْ نَافِعٍ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ إِذَا رَأَى رَجُلًا لَا يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِذَا رَكَعَ وَإِذَا رَفَعَ رَمَاهُ بِالْحَصَى.
নাফে‘ (রাঃ) বলেন, নিশ্চয় ইবনু ওমর (রাঃ) যখন কোন ব্যক্তিকে দেখতেন যে, সে রুকূতে যাওয়া ও উঠার সময় রাফ‘উল ইয়াদায়েন করছে না, তখন তিনি তার দিকে পাথর ছুড়ে মারতেন।[28]
সুধী পাঠক! যারা যঈফ, জাল ও মিথ্যা বর্ণনার পক্ষে উকালতি করেন, তারা এখন কী জবাব দিবেন?
(৮) عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ  قَالَ مَنْ رَفَعَ يَدَيْهِ فِى الصَّلَاةِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ.
(৮) আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে, তার ছালাত হয় না’।[29]
তাহক্বীক্ব : হাদীছটি বাতিল বা মিথ্যা।[30] মুহাম্মাদ তাহের পাট্টানী বলেন, ‘এর সনদে মামূন বিন আহমাদ আল-হারূবী রয়েছে, সে দাজ্জাল। সে হাদীছ জালকারী।[31] আবু নু‘আইম বলেন, ‘সে খাবীছ, হাদীছ জালকারী। সে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির নামে মিথ্যা হাদীছ রচনাকারী’।[32]
(৯) عَنْ أَبِىْ جُعْفَةَ الْقَارِىِّ أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يُصَلِّىْ بِهِمْ فَكَبَّرَ كَمَا حَفَضَ وَرَفَعَ وَكَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حِيْنَ يُكَبِّرُ وَيَفْتَتِحُ الصَّلاَةَ.
(৯) আবু জা‘ফর বলেন, আবু হুরায়রা আমাদের সাথে একদা ছালাত আদায় করলেন, তিনি ছালাতে উঠা-বসা করার সময় তাকবীর দিলেন। কিন্তু শুধু ছালাত শুরুর সময় হাত উঠালেন।[33]
তাহক্বীক্ব : উক্ত শব্দে বর্ণনাটি পরিচিত নয়। বরং এটি ছহীহ হাদীছের বিরোধী। কারণ প্রসিদ্ধ হাদীছের মধ্যে একবার রাফ‘উল ইয়াদায়েনের কথা নেই।[34] তাছাড়া আবু হুরায়রা (রাঃ) ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন মর্মে ছহীহ বর্ণনা এসেছে। যেমন-
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّهُ كاَنَ إِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ.
আবু হুরায়রা (রাঃ) যখন তাকবীর দিতেন, যখন রুকূ করতেন এবং যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন তখন রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন।[35] সুতরাং আবু হুরায়রা (রাঃ) রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন না- এমন দাবী সঠিক নয়।
(১০) عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  مَنْ رَفَعَ يَدَيْهِ فِى الرُّكُوْعِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ.
(১০) আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি রুকূতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করবে, তার ছালাত হবে না।[36]
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল বা মিথ্যা। ইমাম দারাকুৎনী বলেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনু উকাশা নামক রাবী হাদীছ জালকারী’।[37] ইমাম জাওযকানী বলেন, ‘এই হাদীছ বাতিল। এর কোন ভিত্তি নেই। মামূন বিন আহমাদ দাজ্জাল, মিথ্যুক, হাদীছ জালকারী।[38]
(১১) عَنْ أَبِىْ حَنِيْفَةَ أَنَّهُ قَالَ مَنْ رَفَعَ يَدَيْهِ فِى الصَّلَاةِ فَسَدَتْ صَلَاتُهُ.
(১১) আবু হানীফা (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করবে, তার ছালাত নষ্ট হয়ে যাবে।[39]
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি জাল বা মিথ্যা। আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) উক্ত বর্ণনা তার জাল হাদীছের গ্রন্থে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই হাদীছটি মুহাম্মাদ বিন উকাশা আল-কিরমানী জাল করেছে। আল্লাহ তার উপর গযব নাযিল করুন’।[40]
(১২) قَالَ أَبُوْ حَنِيْفَةَ عَنْ حَمَّادٍ عَنْ اِبْرَاهِيْمَ عَنِ الْأسْوَدِ أنَّ عَبْدَ اللهِ ابْنَ مَسْعُوْدٍ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِىْ أَوَّلِ التَّكْبِيْرِ ثُمَّ لَايَعُوْدُ إِلَى شَيْئٍ مِّنْ ذَلِكَ وَيَأْثُرُ ذَلِكَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ  .
(১২) আবু হানীফা হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইবরাহীম থেকে, ইবরাহীম আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) প্রথম তাকবীরে হাত উত্তোলন করতেন। অতঃপর আর হাত উত্তোলন করতেন না। এটা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এরই নিয়ম।[41]
তাহক্বীক্ব : আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর বর্ণনা সম্পর্কে আমরা পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করেছি। সুতরাং এই বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া এই বর্ণনা অনেক ত্রুটিপূর্ণ। কারণ ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর নামে যে সমস্ত বর্ণনা এসেছে, মুহাদ্দিছগণ সেগুলোর ব্যাপারে অনেক আপত্তি তুলেছেন।[42]
জ্ঞাতব্য : রাফ‘উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আওযাঈ (রহঃ)-এর মাঝে কথোপকথন হয়েছিল মর্মে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে। এতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন না করার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়।[43] অথচ এটা চরম মিথ্যাচার। ওবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন, وَالْقِصَّةُ مَشْهُوْرَةٌ بَيْنَالْحَنَفِيَّةِ لَكِنْ لاَ يَشُكُّ مَنْ لَهُ أَدْنَى عَقْلٍ وَدِرَايَةٍ أَنَّهَا حِكاَيَةٌ مُخْتَلَقَةٌ وَأَكْذُوْبَةٌ مُخْتَرَعَةٌ ‘হানাফীদের মাঝে ঘটনাটি খুবই প্রসিদ্ধ। কিন্তু যার যৎ-সামান্য জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, তার নিকট পরিষ্কার যে, এটি একটি বানোয়াট গল্প ও অভিনব মিথ্যাচার’।[44] এমনকি ‘মুসনাদুল ইমামুল আযম’ গ্রন্থে উক্ত ঘটনা উল্লেখ করা হলেও তার টীকাকার ভিত্তিহীন বলেছেন।[45] 
(১৩) عَنْ عَاصِمٍ بْنِ كُلَيْبٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالََ رَأَيْتُ عَلِىَّ ابْنَ أَبِىْ طَالِبٍ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِى التَّكْبِيْرَةِ الْأُوْلَى مِنَ الصَّلَاةِ الْمَكْتُوْبَةِ وَلَمْ يَرْفَعُهُمَا فِيْمَا سِوَى ذَلِكَ.
(১৩) আছেম ইবনু কুলাইব তার পিতা হতে বর্ণনা করেন তিনি বলেছেন, আমি আলী (রাঃ)-কে ফরয ছালাতের প্রথম তাকবীরে দুই হাত উত্তোলন করতে দেখেছি। এছাড়া তিনি অন্য কোথাও হাত তুলতেন না।[46]
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি নিতান্তই দুর্বল। মুহাদ্দিছ ওছমান দারেমী বলেন, আলী (রাঃ)-এর নামে দুর্বল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বায়হাক্বী বলেন, আলী সম্পর্কে এই ধারণা সঠিক নয় যে, তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর কর্মের উপর নিজের কর্ম প্রাধান্য দিয়েছেন। বরং এর রাবী আবুবকর নাহশালীই দুর্বল। কারণ সে এমন রাবী নয়, যার দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় এবং কোন সুন্নাত সাব্যস্ত হয়। ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, আলী, ইবনু মাস‘ঊদ এবং তাদের থেকে যারা হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তারা ছালাতের শুরুতে ছাড়া রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন না মর্মে যে কথা বর্ণিত হয়েছে তা সঠিক নয়।[47]
(১৪) عَنْ أَبِىْ إِسْحَاقَ قَالَ كَانَ أَصْحَابُ عَبْدِ اللهِ وَأَصْحَابُ عَلِىٍّ لاَ يَرْفَعُوْنَ أَيْدِيْهِمْ إِلاَّ فِىْ افْتِتَاحِ الصَّلاَةِ قَالَ وَكِيْعٌ ثُمَّ لاَ يَعُوْدُوْنَ.
(১৪) আবু ইসহাক্ব বলেন, আব্দুল্লাহ (ইবনু মাসঊদ) ও আলী (রাঃ)-এর সাথীরা কেউই ছালাতের শুরুতে ছাড়া তাদের হাত উঠাতেন না। ওয়াকী বলেন, তারা আর হাত উঠাতেন না।[48]
তাহক্বীক্ব : উক্ত বর্ণনাও মুনকার। কারণ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর পক্ষে কিছু বর্ণনা পাওয়া গেলেও আলী (রাঃ) সম্পর্কে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করার স্পষ্ট ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।[49] সুতরাং উপরের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।
عَنْ عَلِىِّ بْنِ أَبِىْ طَالِبٍ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ  أَنَّهُ كَانَ إِذَا قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ الْمَكْتُوْبَةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَيَصْنَعُ مِثْلَ ذَلِكَ إِذَا قَضَى قِرَاءَتَهُ وَأَرَادَ أَنْ يَرْكَعَ وَيَصْنَعُهُ إِذَا رَفَعَ مِنَ الرُّكُوْعِ وَلاَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِى شَىْءٍ مِنْ صَلاَتِهِ وَهُوَ قَاعِدٌ وَإِذَا قَامَ مِنَ السَّجْدَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ كَذَلِكَ وَكَبَّرَ.
আলী (রাঃ) রাসূল (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি যখন ফরয ছালাতে দাঁড়াতেন, তখন তাকবীর দিতেন এবং কাঁধ বরাবর দুই হাত উত্তোলন করতেন। যখন তিনি ক্বিরাআত শেষ করতেন ও রুকূতে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখনও তিনি অনুরূপ করতেন। যখন তিনি রুকূ থেকে উঠতেন তখনও তিনি অনুরূপ করতেন। তবে বসা অবস্থায় তিনি রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন না। কিন্তু যখন তিনি দুই রাক‘আত শেষ করে দাঁড়াতেন, তখন অনুরূপ রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন এবং তাকবীর দিতেন। [50]
সুধী পাঠক! যারা উক্ত মিথ্যা বর্ণনার পক্ষে উকালতি করেন, তারা কি আলী (রাঃ)-কে রাসূল (ছাঃ)-এর অবাধ্য প্রমাণ করতে চান?
(১৫) عَنِ الْأَسْوَدِ قَالَ رَأَيْتُ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِىْ أَوَّلِ تَكْبِيْرَةٍ ثُمَّ لَا يَعُوْدُ.
(১৫) আসওয়াদ (রাঃ) বলেন, আমি ওমর (রাঃ)-কে একবার দুই হাত উত্তোলন করতে দেখেছি। অতঃপর তিনি আর করতেন না।[51] উল্লেখ্য যে, উক্ত মর্মে ওমর (রাঃ)-এর নামে আরো কিছু বর্ণনা এসেছে।[52]  
তাহক্বীক্ব : উক্ত বর্ণনা যঈফ। ইমাম হাকেম বলেন, ‘বর্ণনাটি অপরিচিত। এর দ্বারা দলীল সাব্যস্ত করা যাবে না’।[53] যদিও ইমাম তাহাবী তাকে বিশুদ্ধ বলতে চেয়েছেন।[54] কিন্তু ইবনুল জাওযী তার দাবীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।[55] মূলতঃ ওমর (রাঃ)-এর নামে এ সমস্ত বর্ণনা উল্লেখ করাই মিথ্যাচার। কারণ ওমর (রাঃ) রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন মর্মে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ عُمَرَ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِى الرُّكُوْعِ وَعِنْدَ الرَّفْعِ مِنْهُ.
ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ওমর (রাঃ) রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন।[56]
(১৬) عَنِ اِبْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ قَالَ الْعَشَرَةُ الَّذِيْنَ شَهِدَ لَهُمُ النَّبِىُّ  الجْنَةَ مَاكَانُوْا يَرْفَعُوْنَ أَيْدِيْهِمْ إِلَّا فِىْ اِفْتِتَاحِ الصَّلَاةِ.
(১৬) ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) যে দশজন ছাহাবীর জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা কেউই ছালাতের শুরুতে ছাড়া রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন না।[57]
তাহকবীক্ব : বর্ণনাটি জাল। আলাউদ্দ্বীন আল-কাসানী (মৃঃ ৫৮৮) তার ‘বাদাইউছ ছানায়ে‘-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে আল্লামা বদরুদ্দ্বীন আইনী ছহীহ বুখারী ও আবুদাঊদের ভাষ্যে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেউই কোন সূত্র উল্লেখ করেননি। মূলতঃ উক্ত বর্ণনা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। ড. তাক্বিউদ্দ্বীন বলেন, وَلاَ عِبْرَةَ بِهَذَا الْأَثَرِ مَا لَمْ يُوْجَدْ سَنَدُهُ عِنْدَ مَهْرَةِ الْفَنِّ مَعَ ثُبُوْتِ خِلاَفِهِ فِىْ كُتُبِ الْحَدِيْثِ ‘এই সনদে কোন উপদেশ নেই। কারণ এ বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের নিকটেই এর সনদে কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাছাড়াও হাদীছের গ্রন্থ সমূহে এর বিরোধী দলীলই বিদ্যমান’।[58] কারণ ইবনু আব্বাস (রাঃ) নিজে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন মর্মে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। যেমন-
عَنْ أَبِىْ حَمْزَةَ مَوْلَى بَنِىْ أَسَدٍ قَالَ رَأَيْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلاَةَ وَإِذَا رَكَعَ وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ.
বনী আসাদের গোলাম আবু হামযাহ বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে দেখেছি, তিনি যখন ছালাত শুরু করতেন, যখন রুকূ করতেন এবং যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন তখন রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন।[59]
عَنْ عَطَاءٍ قَالَ رَأَيْتُ أَبَا سَعِيْدٍ الْخُدْرِيَّ وَابْنَ عُمَرَ وَابْنَ عَبَّاسٍ وَابْنَ الزُّبَيْرِ يَرْفَعُوْنَ أَيْدِيَهُمْ.
আত্বা (রাঃ) বলেন, আমি আবু সাঈদ খুদরী, ইবনু ওমর, ইবনু আব্বাস ও ইবনু যুবাইর (রাঃ)-কে দেখেছি, তারা সকলেই ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতেন।[60]
(17) عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِي اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ  قَالَ لا تُرْفَعُ الأَيْدِىْ إِلاَّ فِىْ سَبْعِ مَوَاطِنَ حِيْنَ يَفْتَتِحُ الصَّلاةَ وَحِيْنَ يَدْخُلُ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ فَيَنْظُرُ إِلَى الْبَيْتِ وَحِيْنَ يَقُوْمُ عَلَى الصَّفَا وَحِيْنَ يَقُوْمُ عَلَى الْمَرْوَةِ وَحِيْنَ يَقِفُ مَعَ النَّاسِ عَشِيَّةَ عَرَفَةَ وبِجَمْعٍ وَالْمَقامَيْنِ حِيْنَ يَرْمِى الْجَمْرَةَ.
(১৭) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাঃ) বলেন, সাতটি স্থান ব্যতীত হাত উত্তোলন করা যাবে না। যখন ছালাত শুরু করবে, যখন মসজিদে হারামে প্রবেশ করে কা‘বা ঘর দেখবে, যখন ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ে উঠবে, যখন আরাফার ময়দানে সকলে একত্রে অবস্থান করবে এবং যখন পাথর মারবে তখন দুই স্থানে হাত উত্তোলন করবে।[61]
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি মিথ্যা ও বাতিল।[62] এমনকি ‘হেদায়ার’ ভাষ্যকার ইবনুল হুমামও তার বিরোধিতা করেছেন। যেমন-
لَمْ يَسْمَعِ الْحَكَمُ عَنْ مَقْسَمٍ إِلاَّ أَرْبَعَةَ أَحَادِيْثَ لَيْسَ هَذَا مِنْهَا فَهُوَ مُرْسَلٌ وَغَيْرُ مَحْفُوْظٍ قَالَ وَأَيْضًا فَهُمْ يَعْنِي أَصْحَابَنَا خَالَفُوْا هَذَا الْحَدِيْثَ فِىْ تَكْبِيْرَاتِ الْعِيْدَيْنِ وَتَكْبِيْرَةِ الْقُنُوْتِ.
‘হাকাম মাক্বসাম থেকে মাত্র চারটি হাদীছ শুনেছে। সেগুলোর মধ্যেও এটি নেই। সুতরাং তা মুরসাল ও অরক্ষিত। তাছাড়া আমাদের মাযহাবের লোকেরা ঈদ ও জানাযার তাকবীরের ব্যাপারে বিরোধীতা করেছে।[63] দুঃখজনক হল, উক্ত বাতিল বর্ণনার আলোকেই ‘হেদায়া’ কিতাবে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করতে নিষেধ করে বলা হয়েছে যে,وَلَا يَرْفَعُ يَدَيْهِ إلَّا فِي التَّكْبِيْرَةِ الْأُولَى  ‘প্রথম তাকবীর ছাড়া আর হাত উঠাবে না’। উক্ত বর্ণনাটি যাচাই না করেই ‘হেদায়া’ গ্রন্থকার রাফ‘উল ইয়াদায়েনের বিরুদ্ধে উক্ত বর্ণনা পেশ করেছেন।[64]
সুধী পাঠক! জাল ও যঈফ হাদীছ পেশ করে যদি সুন্নাতের উপর আমল করতে বাধা প্রদান করা হয়, তবে মানুষ কিভাবে হাদীছের দিকে ফিরে আসবে? পরবর্তীতে মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ) যে উদারতা প্রদর্শন করেছেন তাও ‘হেদায়া’ সংকলক দেখাতে পারেননি। মাওলানা রাফ‘উল ইয়াদায়েনের পক্ষে লিখেছেন, ‘রুকু করার নিয়মঃ রাসূলুল্লাহ (ছ) কেরাআত শেষে সামান্য কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে তার পর তাকবীরে তাহরীমার সময়ের মত উভয় হাত তুলে তাকবীর বলতেন এবং রুকুতে যেতেন’।[65]